কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) জনক হিসেবে পরিচিত নোবেলজয়ী কম্পিউটার বিজ্ঞানী জিওফ্রে হিন্টনের মতে, শেষ পর্যন্ত হয়তো দেখা যাবে এআই তৈরি না করলেই মানবজাতির জন্য ভালো হতো। দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি সতর্ক করেছেন — এই বছরই হোক বা আগামী বছরে, এআই বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে; যেমন আর্থিক ব্যবস্থা কিংবা বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে অচল হয়ে যাওয়া। তবে তিনি নিজেকে পুরোপুরি হতাশাবাদী বলতে রাজি নন; তাঁর মতে, এআই বিস্ময়কর ভবিষ্যতের দিকেও নিয়ে যেতে পারে — যদিও এটি বানানো ভুল ছিল কি না, সেই প্রশ্ন এখন থেকেই যাচ্ছে।
হিন্টনের ভাষ্য, আগামী এক দশকের মধ্যে — হয়তো তার আগেই — মানবজাতি জানতে পারবে এআইয়ের ঝুঁকি আদৌ সামলানো সম্ভব কি না। সম্ভব হলে আসতে পারে তাঁর ভাষায় ‘আমূল প্রাচুর্য’-এর যুগ; আর সামলানো না গেলে অপেক্ষা করছে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে বিশাল ব্যবধান, বিশাল সাংস্কৃতিক সংকট, ব্যাপক বেকারত্ব আর ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া সমাজ। এআই নিয়ে তৈরি নতুন পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রামাণ্যচিত্র ‘এআই: প্রবাবলি নাথিং টু ওয়ারি অ্যাবাউট’-এর প্রদর্শনীর আগে এসব কথা বলেন তিনি। মজার বিষয়, প্রামাণ্যচিত্রটির নামটিও একটি এআই চ্যাটবটেরই দেওয়া; এতে হিন্টনের পাশাপাশি আছেন তাঁর সাবেক গুগল সহকর্মী ডেমিস হাসাবিসও। এই ইস্যুতে নিজের খ্যাতিকে মুখপাত্র হিসেবে কাজে লাগানোকে তিনি নিজের দায়িত্ব বলে মনে করেন।
শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নেতাদের কড়া সমালোচনা করেছেন ৭৮ বছর বয়সী এই বিজ্ঞানী। চ্যাটজিপিটি নির্মাতা ওপেনএআইয়ের প্রধান স্যাম অল্টম্যানকে তিনি ‘একদমই বিশ্বাস করেন না’ বলে জানিয়েছেন। তাঁর মতে, মার্ক জাকারবার্গ, ইলন মাস্ক ও অল্টম্যান ঝুঁকিগুলো ভালো করেই বোঝেন, কিন্তু সেগুলো মোকাবিলার চেয়ে অর্থকেই অগ্রাধিকার দিয়েছেন। প্রায় ৪৪ বছর ধরে এআই নিয়ে কাজ করা হিন্টন ১৯৭০-এর দশকে মানুষের মতো শিখতে ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে পারে এমন গাণিতিক ব্যবস্থা ‘নিউরাল নেটওয়ার্ক’-এর ধারণা দিয়েছিলেন। ২০২৩ সালে তিনি গুগল ছাড়েন এআইয়ের ঝুঁকি নিয়ে মুক্তভাবে কথা বলার জন্য; তখন সতর্ক করেছিলেন, এআই ব্যবস্থাগুলো আরও নিয়ন্ত্রণ পাওয়ার দিকে ঝুঁকলে মানবজাতি বিপদে পড়বে।
তাঁর মতে, সতর্কবার্তা ইতিমধ্যে এসে গেছে। এই গ্রীষ্মে ওপেনএআইয়ের এআই এজেন্টরা ষড়যন্ত্র করে হ্যাগিং ফেস ওয়েবসাইট হ্যাক করার চেষ্টা করেছিল — ঘটনাটিকে তিনি তুলনা করেছেন ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের থ্রি মাইল আইল্যান্ড পারমাণবিক দুর্ঘটনার সঙ্গে, যা ছিল একটা আগাম সতর্ক সংকেত। হিন্টনের ভবিষ্যদ্বাণী, এই বছর বা আগামী বছরে ঘটতে পারে ‘চেরনোবিল-ধাঁচের’ ঘটনা — পারমাণবিক দুর্ঘটনা নয়, বরং এআই-সক্ষম হামলায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক বিভ্রাট, কিংবা এক সপ্তাহের জন্য আর্থিক ব্যবস্থা মুখ থুবড়ে পড়ার মতো কিছু। সমাজ এমন ধাক্কা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে পারবে, কিন্তু তখন নেতারা সজাগ হবেন — অবশ্য তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, ‘নেতা’ বলতে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প ছাড়া অন্য বিশ্বনেতাদের বুঝিয়েছেন।
সমাধান হিসেবে হিন্টনের প্রস্তাব, ওষুধের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন (এফডিএ) যেমন করে, এআইয়ের ক্ষেত্রেও তেমন স্বাধীন কর্তৃপক্ষ থাকা উচিত — কোনো মডেল বাজারে ছাড়ার আগে কোম্পানিকে পরিসংখ্যানগত শক্ত প্রমাণ দিতে হবে যে সেটি ক্ষতির চেয়ে বেশি উপকার করে। ১৯৫০-এর দশকের থ্যালিডোমাইড ওষুধের উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, পণ্য ছেড়ে দিয়ে পরে মামলায় যাওয়া সঠিক পথ নয় — অথচ বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এআইয়ের ক্ষেত্রে ঠিক এটাই প্রস্তাব করছে। ফিনল্যান্ডের প্রেসিডেন্টসহ ৩৩টি দেশের সমর্থিত একটি অপেক্ষাকৃত কঠোর পরিকল্পনার পক্ষে তিনি — যেখানে শক্তিশালী এআই মডেলের বাধ্যতামূলক পরীক্ষা, স্বাধীন মূল্যায়ন ও আন্তঃসরকারি অভিন্ন মান থাকবে। এর বিপরীতে ট্রাম্প এআই নিয়ন্ত্রণে যেকোনো বৈশ্বিক কাঠামোর ধারণা সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছেন; তিনি চান কোম্পানিগুলো নিজেরাই নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করুক। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহ্যাম জানিয়েছেন, আগামী বছর দেশটির জি-২০ সভাপতিত্ব কাজে লাগিয়ে তিনি বৈশ্বিক নীতিমালা ও মান নিয়ে ঐকমত্যের চেষ্টা করবেন।
এআইয়ের জনক হওয়ায় হিন্টনকে অনেকেই তুলনা করেন পারমাণবিক অস্ত্রের জনক রবার্ট ওপেনহাইমারের সঙ্গে; এক বন্ধু তো তাঁকে ওপেনহাইমার-ধাঁচের টুপিও কিনে দিয়েছেন। তবে হিন্টন এই তুলনা মানেন না — তাঁর যুক্তি, নিউরাল নেটওয়ার্ক নিয়ে তাঁর পাশাপাশি আরও হাজারো বিজ্ঞানী কাজ করেছেন। সব সতর্কবার্তার পরও শেষ পর্যন্ত তিনি আশাবাদীই: তাঁর অন্তর্দৃষ্টি বলছে, মানুষ এখনো নিয়ন্ত্রণে আছে এবং বড় ধরনের প্রচেষ্টা চালালে বিপর্যয় এড়ানো সম্ভব হতে পারে।






